শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪ , ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

Dainik Provat

মৃত্যুর পরও ফ্যাশন জগতে অমলিন তারা

জীবন যেখানে যেমন

প্রকাশিত: ০৯:৫৫, ২৮ জুলাই ২০২৩

সর্বশেষ

মৃত্যুর পরও ফ্যাশন জগতে অমলিন তারা

ছবি সংগ্রহ

ফ্যাশনের নতুন ট্রেন্ড, আর ফ্যাশন নিয়ে নানান পরামর্শ জানতে মানুষ এখন বেছে নিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্ম বা ইন্টারনেটকে। আজকাল কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই চলে আসে একেকটি নতুন ট্রেন্ড। আবার একইভাবে উধাও হয়ে যায় নিমেষেই। চোখের পলকে ফ্যাশনিস্তাদের মস্তিষ্ক ও মানিব্যাগ চলে যায় সেটির দখলে। সাথে আছে তারকাদের ফ্যাশন ও জীবনযাপন। দেশ বিদেশের বিভিন্ন সেক্টরের তরুণ তারকাদের ব্যক্তিগত স্টাইলকে অনুসরণও করছেন নেটিজেনরা। বলা যায়, বর্তমান সময়ে সেলিব্রেটিরা চাইলেই মুহূর্তের মাঝে নিজের পরখ করা যেকোনো কিছু ভক্তদের সাথে শেয়ার করতে পারছেন এবং নিমিষেই তা পৌঁছে যাচ্ছে ভক্তদের মাঝে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার আগের যুগে যারা ফ্যাশন আইকন ছিলেন, তাদের জন্য এই ব্যাপারটা অত সহজ ছিল না। তবুও সেই সব ফ্যাশন আইকনদের পোশাক আর স্টাইলগুলো সাধারণ মানুষ সহজেই পছন্দ করতো। এসব আইকনরা ব্যক্তিগত জীবনেও সফল ছিলেন, তাদের ‘ফ্যাশন সেন্স’ তাদেরকে আলাদাভাবে সবার মধ্যমণি করে রাখতো। মারা যাবার পরও তারা বেঁচে আছেন ফ্যাশনিস্তাদের মনে। ফ্যাশন আইকন এমনই ৬ জনের গল্প থাকছে এবার।

মেরিলিন মনরো
ফ্যাশন জগতে মেরিলিন মনরো ছিলেন এক অবিস্মরণীয় নাম। কিংবদন্তি জেমস ডিন ও এলভিস প্রিসলির মতো মনরো তার গ্ল্যামার, সুন্দর চেহারা এবং ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র তারকাসহ বিভিন্ন আবেদনময়ী রূপে ভক্তদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন। এতদিনেও হারিয়ে যায়নি মনরোর ‘গোলাপি গাউন’, দ্য সেভেন ইয়ার ইচ সিনেমায় ‘উড়তে থাকা সাদা পোশাক’ বা প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির জন্মদিনে পরে আসা ‘হ্যাপি বার্থডে ড্রেস’। পিটার প্যান কলার, পুডল স্কার্ট ও আবেদনময়তার যুগে মনরোর সাহসী সিদ্ধান্ত তাকে ফ্যাশন কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। গ্ল্যামার, সৌন্দর্য আর ক্যামেরার সামনে আবেদনময়ী উপস্থাপনা; মেরিলিন মনরোর জন্য হলিউডে যাত্রাটা ছিল স্বপ্নের মতই। ১৯২৬ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্মগ্রহণ করেন হলিউডের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আবেদনময়ী এই অভিনেত্রী। ক্যারিয়ারে তার যাত্রাটা হয়েছিল একজন মডেল হিসেবে। তারপর নজরে আসেন টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের বেন লিয়নের; তারপরের যাত্রাটা সিনেমার জন্য একটি ইতিহাস। সিনেমার পর্দায় মনরোর আবির্ভাব ঘটতো একজন অভিনেত্রী এবং ফ্যাশন আইকন হিসেবে। প্রতিনিয়ত পোশাকে চমক তৈরি করতে থাকা মনরোর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। দর্শকরা অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতো কখন মনরো নতুন কোনো আউটফিট নিয়ে সবার সামনে হাজির হবে! তার সবচেয়ে বিখ্যাত পোশাকটি ছিল সাবওয়েতে দাঁড়ানো অবস্থায় যখন বাতাস তার পোশাকটি নিয়ে দুষ্টুমি করছিল, আর সে হাত দিয়ে সেটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিল! বর্তমান সময়ে এসেও পোশাক আর আবেদনময়তার এমন মিশ্রণ কেউ তৈরি করতে পারেনি।

 

প্রিন্সেস ডায়ানা
রাজকন্যার চলনে-বলনে রাজসিক ছাপ থাকবেই। ব্রিটিশ রাজপরিবারের পুত্রবধূ প্রিন্সেস ডায়ানা সে ধারাতেও শুরু করেছিলেন নতুন চল। পোশাকের কেতা থেকে আদবকেতা পর্যন্ত সবকিছুতেই নিজের রুচির ছাপ রেখেছিলেন ‘প্রিন্সেস ডি’ অথবা ‘শাই ডি’। সাধারণ মানুষ যেমন তাকে গ্রহণ করেছিল দ্রুত, তেমনই স্টাইল আইকনে পরিণত হতেও তার সময় লাগেনি। ছোট ছাটের কিছুটা পেজবয়, কিছুটা বব ধাঁচের চুলের জন্য ডায়ানার স্টাইল বিখ্যাত। গত ৫০ বছরের ‘মোস্ট আইকনিক হেয়ারস্টাইল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তার এই চুলের সাজ। ‘ডায়ানা কাট’ বলে তার চুলের ধরন নারী, বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তার নামে গোলাপ ফুলের লাল সাদা শেডের একটি বিশেষ জাতের নামকরণও করা হয়েছে। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ এই ১৬ বছর ধরে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফ্যাশন আইকনদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেনও। রাজপরিবারের পুত্রবধূ হয়েও তিনি ব্রিটিশ রানির চেয়ে জনপ্রিয়। ডায়ানার পোশাকগুলোকে বলা হয় সব সময়ের সেরা ফ্যাশনেবল পোশাক। ডায়ানা বেঁচে থাকতে ও মৃত্যুর পরে নানা সেবামূলক কাজে তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি হয়েছে সেসব পোশাক। ডায়ানার পোশাক সবচেয়ে বেশি নকশা করেছেন ফরাসি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ডিজাইনার ক্যাথেরিন ওয়াকার। এ ছাড়া ক্রিস্টিনা স্ট্যাম্বোলিয়ান ও ভিক্টর এডেলস্টাইন তার কিছু পোশাকের নকশা করেন। নতুন করে বসন্তের গরমে ট্রেন্ডে এসেছে ফ্লোরাল প্রিন্ট।

অড্রি হেপবার্ন
ফ্যাশন সম্পর্কে তার সচেতনতা আর দীপ্তিময় দেহসৌষ্ঠব হেপবার্নকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। হলিউডে হেপবার্ন একজন চলচ্চিত্র ও ফ্যাশন আইকন হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট কর্তৃক মার্কিন চলচ্চিত্র ইতিহাসের তৃতীয় সেরা নারী কিংবদন্তী হিসেবে স্বীকৃতি পান। আন্তর্জাতিক সেরা পোশাক-পরিধানকারী তালিকা হল অফ ফেমেও স্থান পান। হুবার্ট ডি গিভেঞ্চি, আইজ্যাক মিজরাহিরা তাই যুগ-যুগ পরেও নিজেদের পোশাকে কোনো না কোনোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন হেপবার্নের প্রতিচ্ছবিকে। ১৯৯৩ সালে মৃত্যুর পরও তার প্রভাব রয়ে গেছে, ভিক্টোরিয়া বেকহাম, জনি ডেপদের এবং অলসেন টুইনদের (মেরি কেইট অলসেন, এলিজাবেথ অলসেন) মতো তারকাদের মাঝে। ব্রেকফাস্ট এ্যাট টিফানিস চলচ্চিত্রে হেপবার্নের পরা কালো পোশাক ও চুলের স্টাইল চমক জাগিয়েছিল তরুণীদের মাঝে। তার পরিচ্ছদের ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয় ছোটো কালো পোশাকটি যখন পরে তিনি বেরিয়েছিলেন, মুহূর্তের ভেতর ব্যাপারটি সবার নজর কেড়ে নেয়। কতটুকু কাপড় জড়িয়েছেন সেটা মুখ্য নয়, বরং তার পোশাক সচেতনতার ব্যাপারটি ছিল সহজাত।

ডায়ানা রস
১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া এই আমেরিকান গায়িকা তার অ্যালবামের মাধ্যমে নিজের পোশাককে তুলে ধরেছিলেন একে-একে। সত্তর থেকে আশির দশকের দিনগুলোতে গানের মঞ্চে তার আবির্ভাব ঘটতো নতুন কোনো পোশাকের হাত ধরে। কস্টিউম আর দৈনন্দিন জীবনের পোশাকের মাঝে যে কোনো ভিন্নতা হতে পারে না, তার ধারণা দিয়েছিলেন ডায়ানা। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার বব মিকির করা ডিজাইনের অনেকগুলো পোশাকে ডায়ানার পরিচ্ছদ স্টাইলের ছাপ ছিল স্পষ্ট। পেশাগত জীবনে ডায়ানা ছিলেন ‘দ্য সুপ্রিমে’ এর ভোকালিস্ট, এছাড়াও তিনি ছিলেন অভিনেত্রী এবং একজন প্রযোজক। বলা বাহুল্য, তার ফ্যাশন নিয়ে এমন চেতনা হঠাৎ করেই উদয় হয়নি, তিনি নিজেও একসময় ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

ম্যাডোনা
প্রতিনিয়তই নিজেকে বদলেছেন ম্যাডোনা, পোশাকের ক্রমবিকাশের সঙ্গী করে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অন্যরকম এক উচ্চতায়। তার কাজের সঙ্গী হয়েছিলেন জিন পল গলটিয়ের, ডোনাটেলা ভারসেক এবং জেরেমি স্কট এর মতো ফ্যাশন ডিজাইনাররা। গান নিয়ে বিশ্বভ্রমণ আর সাথে নিত্যনতুন সব চমকপ্রদ ফ্যাশন ডিজাইনের সাথে বিশ্বকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তার যাত্রা পূর্ণতা পেয়েছিল। ম্যাটেরিয়াল গার্ল, পপের রানী- এই তকমাগুলো কেবল ম্যাডোনার বেলাতেই খাটে। সত্তর-আশির দশক পেরিয়ে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি মঞ্চ মাতিয়েছেন। এটা তার ক্যারিয়ারের শুরু নয়, শুরুটা হয়েছিল একজন স্বপ্নবাজ তরুণীর নর্তকী হওয়ার মাধ্যমে। সত্তরের শুরুতে সর্বপ্রথম নিউইয়র্কে পা রাখেন এই তরুণী একজন বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপআউট হিসেবে। ভাগ্যের সন্ধানে নেমে বেছে নেন নর্তকীর পেশা। কিন্তু এটাই তার লক্ষ্য ছিল না, তিনি এখানে এসেছিলেন আরও বড় কিছু হওয়ার জন্য। সেই তাড়নায় ম্যাডোনা সর্বপ্রথম ১৯৮৩ সালে তার একক পপ মিউজিকের এলবাম বের করেন। এটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দর্শকদের সামনে তার ফ্যাশন লুক সবার নজর কেড়ে নিতে সক্ষম হয়। রাতারাতি তার আউটফিট বিখ্যাত বনে যায় এবং ট্রেন্ড হিসেবে দ্রুত সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। এমন ঘটনাই একজন নতুন ম্যাডোনাকে জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। পপ মিউজিকের তালে-তালে নাচ আর নিত্যনতুন সব ফ্যাশনেবল আউটফিটের মাধ্যমে দর্শকদের মাতিয়ে রাখতেন ম্যাডোনা। একজন আর্টিস্টের পোশাক ব্যবহারে নতুন সংজ্ঞা নিয়ে আসেন তিনি।

এলিজাবেথ টেইলর
এলিজাবেথ টেইলরকে রুপালি পর্দার রানী, আবেদনময়ী, সৌন্দর্যের রানী কিংবা অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। এলিজাবেথের জন্ম ১৯৩২ সালে লন্ডন শহরে, পেশায় অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। নিজের অভিনয় ক্যারিয়ারে সেইসময়ের সেরা কিছু সিনেমার উপহার দিয়েছিলেন এলিজাবেথ, পেয়েছিলেন সেরা অভিনেত্রীর তকমাও। নিজেকে একজন ফ্যাশন আইডল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন সবসময়। তার ফ্যাশন সচেতনতা আর গ্ল্যামার মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। সিনেমার পর্দায় এলিজাবেথের আবির্ভাব ঘটতো নিত্যনতুন সব পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে। শুধু সিনেমাতেই নয়, তার ফ্যাশন সচেতনটা প্রকাশ পেত নিত্যদিনের পোশাকেও। হোক সেটা সাঁতার কিংবা একান্ত সময় পার করার ক্ষেত্রে । প্রতিটি পোশাকের মাঝেই তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনার ছাপ ফুটে উঠত। মানুষ এসব পোশাক ধারণাকে একান্ত নিজেদের করে নিয়েছে, সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় বহুবছর পর আজকের এই সময়ে এসেও। দৈনন্দিন জীবনে গ্ল্যামারকে নিজের সহজাত করে নেয়া এই ফ্যাশন আইকন সবসময়ই ডায়মন্ডের নেকলেস গলায় জড়িয়ে রাখতেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়